Skip to main content

(০৭) মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

প্রারম্ভিক কথা: মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা একজন মানুষের মানসিক শান্তি এবং দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে। ইসলাম মনের শান্তি, ধৈর্য, এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব বোঝায় এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর নির্দেশনা দেয় যাতে তারা নিজেদের আবেগ ও চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এখানে আমরা আলোচনা করব, মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা নিয়ে ইসলাম কী বলে এবং কিভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়।

১. আবেগের প্রতি নিয়ন্ত্রণ:

ইসলাম আমাদের শেখায় আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার গুরুত্ব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: "তুমি যা জানো তা ছাড়া কিছুই বলো না।" (আল-ইসরা: 36)। মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, যেমন অতিরিক্ত ক্রোধ, হতাশা বা উদ্বেগ, তখনই ঘটে যখন তুমি আবেগের দিকে অতি মনোযোগী হয়ে ওঠো। ইসলাম আমাদের শেখায় ধৈর্য ধারণ করতে, যেন আবেগের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে।

২. ধৈর্য ধারণ করা:

ধৈর্য ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। যখন তুমি মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলো, তখন আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা জরুরি। কুরআনে বলা হয়েছে: "হে যারা ঈমান এনেছো, ধৈর্য ধারণ করো এবং একে অপরকে সহায়তা করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (আل-ইমরান: 200)। ধৈর্যই তোমাকে মনের শান্তি এবং নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করবে।

৩. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা):

মনের নিয়ন্ত্রণ হারানো যখন তুমি তোমার সমস্যা সমাধান করার শক্তি অনুভব না করো, তখন তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। ইসলাম আমাদের শেখায় যে, "তুমি আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, কারণ আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী।" (আল-তাওবা: 51)। আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস তোমাকে আত্মবিশ্বাস এবং শান্তি দেবে, যা মনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য খুবই প্রয়োজন।

৪. নফসের নিয়ন্ত্রণ:

ইসলামে নফস (অন্তরের প্রলোভন) নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন: "যে নিজের নফসকে অগ্রাধিকার দেয়, সে পাপী হয়ে যায়, আর যে তার নফসকে প্রশমিত করে, সে সফল হয়।" (আল-ক্বিয়ামাহ: 30-31)। মনের নিয়ন্ত্রণ হারানো অনেক সময় নফসের প্রভাবে ঘটে, তাই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। নফসের প্রলোভনে পড়ে মনের শান্তি হারিয়ে ফেলা মানে ঈমানের দুর্বলতা হতে পারে।

৫. দোয়া এবং জিকির:

ইসলামে দোয়া এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করার (জিকির) মাধ্যমে মনের শান্তি ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: "স্মরণ করুন, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়।" (আল-রাজ: 28)। মনের শান্তি ফিরিয়ে আনতে তুমি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারো এবং দোয়া করতে পারো, যা তোমার চিন্তাভাবনাকে শান্ত করে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৬. সরাসরি সমাধান না পাওয়া:

ইসলাম আমাদের শেখায় যে, জীবনের সমস্যা সমাধান পেতে ধৈর্য এবং সহানুভূতির প্রয়োজন। নবী (সা.) বলেছেন: "তোমরা নিজেদের মনকে শান্ত রাখো এবং সহ্য করো, কারণ আল্লাহ তোমাদের উপরে জানেন এবং তিনি তোমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।" (সহীহ মুসলিম)। মনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুহূর্তে, শান্ত থাকা এবং প্রভাবিত না হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার:

মনের নিয়ন্ত্রণ হারানো কখনোই ভালো সংকেত নয়। ইসলামে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখার মাধ্যমে আমরা মনের শান্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারি। জীবনকে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করার জন্য নফসের প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে হবে, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে এবং নিজের আবেগ ও মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

Comments

Popular posts from this blog

(০৫) অতিরিক্ত কান্না: শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্ভাবনা

প্রারম্ভিক কথা: কান্না এক ধরনের আবেগগত প্রতিক্রিয়া, যা মানুষের মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। কখনো কখনো কান্না স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় হতে পারে, তবে অতিরিক্ত কান্না শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইসলামের শিক্ষাও আমাদের জানায় যে, অতিরিক্ত কান্না ক্ষতিকর হতে পারে। এই আর্টিকেলে তুমি অতিরিক্ত কান্নার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারবে। ১. মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ বাড়ানো: অতিরিক্ত কান্না মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। কান্নার মাধ্যমে তুমি তোমার দুঃখ বা হতাশা প্রকাশ করতে পারো, তবে অতিরিক্ত কান্না মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তার অনুভূতি আরও বৃদ্ধি করে। হাদিসে এসেছে, "আল্লাহ বলছেন, তুমি যদি ধৈর্য ধারণ না করো, তবে কষ্ট তোমার উপর বেড়ে যাবে।" (সহীহ মুসলিম) ২. শারীরিক ক্ষতি: কান্নার সময় শরীরে কিছু শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, যেমন হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট। যদি তুমি দীর্ঘ সময় ধরে কান্না করো, এটি শরীরের উপর চাপ ফেলতে পারে, যা হৃদয়ের এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হাদিসে বলা হয়েছে, "ধৈর্যশীলরা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্ক...

(০১) জীবন পরিচালনায় সুন্দর দিকনির্দেশনা

তোমার জীবনের এমন একটি সময় চলছে, যা হয়তো অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্ন নিয়ে এসেছে। নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব এবং ভালোবাসার আশা—সবকিছু মিলিয়ে একটি সুন্দর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নে যখন আঘাত আসে, তখন মনে হয়, যেন সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে। মনে রেখো, এই সময়টুকু শুধু একটি পরীক্ষা। আল্লাহ আমাদের জীবনে পরীক্ষা দেন, যাতে আমরা আরো শক্তিশালী হতে পারি। নিচে তোমার জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো, যা তোমার মনে সাহস এবং পথপ্রদর্শনের আলো জ্বালাবে। ১. নিজের মূল্য বোঝো আল্লাহ তোমাকে সেরা অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। তিনি কুরআনে বলেন, ‘আমি মানুষকে সেরা অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আত-তীন, ৯৫:৪) তোমার নিজের মূল্য বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি তোমাকে ছোট করে দেখে, তা আল্লাহর দেয়া সম্মানের অবমূল্যায়ন। নিজের মর্যাদাকে কখনো অবহেলা করো না। তুমি আল্লাহর অমূল্য সৃষ্টি। ২. সম্পর্কের মূল ভিত্তি: সম্মান ও ভালোবাসা বিয়ে শুধু ভালোবাসার জন্য নয়, এটি একটি প্রতিশ্রুতি এবং সম্মানের বন্ধন। নবী করিম (সা.) বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।’ (তিরমিজি, ১১৬২) যদি তোমার স্বামী এই সম্মা...

Storex